সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া শিশু ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে এমন সব খবর প্রকাশিত হচ্ছে, যা শুধু বিবেককে নাড়া দেয় না, বরং আমাদের সমাজের বর্তমান অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।
একসময় আমরা ভাবতাম, বয়স, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পারিবারিক অবস্থান একজন মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। আজ চার-পাঁচ বছরের নিষ্পাপ শিশুও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। আবার এমন ঘটনাও সামনে আসছে, যেখানে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ পর্যন্ত ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি অসুস্থ সমাজব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কোথায় ভুল করছি?
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে, সমাজে নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন তথ্যপ্রবাহ, অশ্লীল ও বিকৃত কনটেন্টের বিস্তার এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও বাড়িয়েছে। অনেক তরুণ-যুবক এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে, যেখানে দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও আত্মসংযমের শিক্ষা পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।
আরেকটি বড় কারণ হলো মাদকের বিস্তার। মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়। মাদকের প্রভাবে মানুষের বিচারবোধ, বিবেক এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই ভয়ঙ্কর অপরাধের দিকে ঝুঁকে যায়।
তবে শুধু মাদক বা প্রযুক্তিকে দায়ী করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্র—সবারই নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে। একটি শিশুর চরিত্র গঠনের শুরু হয় পরিবার থেকে। এরপর বিদ্যালয়, সমাজ এবং রাষ্ট্র সেই শিক্ষাকে পরিপূর্ণতা দেয়। এই প্রতিটি স্তরে যদি দুর্বলতা তৈরি হয়, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়বেই।
আমরা প্রায়ই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিবাদ করি, মানববন্ধন করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করি। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়। প্রয়োজন পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, শিশুদের নিরাপত্তা শিক্ষা, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন এবং নৈতিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।
একই সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনো সমাজের জন্যই শুভ নয়। অপরাধীকে তার পরিচয়, প্রভাব বা অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে অপরাধ করলে তার পরিণতি অবশ্যই তাকে ভোগ করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সমাজ রাতারাতি ধ্বংস হয় না। ধীরে ধীরে যখন নৈতিকতা দুর্বল হয়, মানবিকতা হারিয়ে যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কমে যায়, তখনই সমাজ অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যায়। আজ যে শিশুটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, আগামীকাল সেই সমাজের ভবিষ্যৎও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে।
তাই এখন সময় এসেছে শুধু ঘটনা নিয়েই আলোচনা করার নয়, বরং সমাধানের পথ খোঁজার। আমাদের সন্তানদের শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যাংকার বা ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুললেই হবে না; তাদের আগে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ নৈতিকতা ও মানবিকতা ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই নয়।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার সুউচ্চ ভবন বা অর্থনৈতিক অর্জনে নয়; বরং তার শিশু, নারী এবং দুর্বল মানুষের নিরাপত্তায়। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে কোনো শিশু ধর্ষণের শিকার হবে না, কোনো নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না এবং কোনো মানুষ মানবিকতা হারিয়ে পশুত্বের পর্যায়ে নেমে যাবে না।
আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটি নিরাপদ, মানবিক ও নৈতিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করি।
সবার আগে বাংলাদেশ, সবার আগে দেশের মানুষ।
লেখক— মোঃ মিজানুর রহমান
শাখা প্রধান, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, পিরোজপুর কর্পোরেট শাখা।
Reporter Name 















