পিরোজপুর প্রতিনিধি :
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পক্ষে-বিপক্ষে মতামতও আসছে। কেউ বলছেন, মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় বেতন সমন্বয় সময়ের দাবি। আবার কেউ মনে করছেন, এতে সরকারের ব্যয় বাড়বে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদকে উপেক্ষা করে কি উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব?
বাংলাদেশ গত এক যুগে অবকাঠামো, ডিজিটাল সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক আধুনিকায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব অর্জনের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরবচ্ছিন্ন শ্রম ও সম্পৃক্ততা রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন, রাজস্ব আদায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসন মূল চালিকাশক্তি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সরকারি চাকরিজীবীদের আয় সেই হারে সমন্বিত হয়নি। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তাদের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বেতন বৃদ্ধি এখন কেবল সুবিধা নয়, অনেকাংশে বাস্তবতার স্বীকৃতি।
সম্প্রতি সিপিডি বেতন বৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, এতে সরকারের ব্যয় বাড়বে এবং আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগটি অমূলক নয়। তবে শুধু ব্যয়ের হিসাব দিয়ে পুরো বিষয়টি মূল্যায়ন করাও যথেষ্ট নয়।
রাষ্ট্র যখন একটি সেতু নির্মাণ করে, তখন সেটিকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। কারণ ভবিষ্যতে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করে। একইভাবে দক্ষ, সৎ ও কর্মক্ষম প্রশাসনের পেছনে ব্যয়ও একটি বিনিয়োগ। কারণ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সেবা প্রদান এবং নীতির সফল প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত মানুষের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।
অনেক উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে সরকারি চাকরিকে আকর্ষণীয় রাখা হয় মূলত মেধাবী জনশক্তিকে রাষ্ট্রীয় সেবায় ধরে রাখার জন্য। বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বর্তমানে বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক খাতে অধিক বেতন ও সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক মেধাবী তরুণ সরকারি চাকরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রশাসনের সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই আলোচনায় আসে—বেতন বাড়লে কি দুর্নীতি কমবে? এর সরল উত্তর নেই। তবে এটুকু সত্য যে আর্থিক নিরাপত্তা কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অবশ্যই বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কঠোর জবাবদিহিতা, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও বেতন বৃদ্ধি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। কয়েক লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয় বাড়লে তাদের ভোগব্যয়ও বাড়বে। এতে বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল হবে এবং সরকারও পরোক্ষভাবে কর ও ভ্যাটের মাধ্যমে একটি অংশ পুনরুদ্ধার করতে পারবে।
তাই সরকারি বেতন বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা কেবল রাজস্ব ব্যয়ের খাতায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রশ্নটি মূলত রাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রশাসনের দক্ষতা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে যেমন সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটি দক্ষ, উদ্যমী ও আর্থিকভাবে নিরাপদ প্রশাসন।
রাষ্ট্রের কর্মচারীদের জন্য যৌক্তিক বেতন নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম পূর্বশর্ত। কারণ শক্তিশালী প্রশাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কেবল পরিকল্পনার কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
লেখক-মোঃ মিজানুর রহমান,
শাখা প্রধান,রুপালী ব্যাংক পিএলসি,পিরোজপুর কর্পোরেট শাখা।
Reporter Name 















